২৩শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনলাইন সংস্করণ

এ সম্পর্কিত আরও খবর

স্বচক্ষে দেখা জুলাই-২৪

লেখক: হুমায়ুন আহামেদ

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া অহিংস ছাত্র আন্দোলনটি ১৫ জুলাই থেকে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কোটা সংস্কারের দাবিতে টানা অহিংস আন্দোলন শুরু করেন। আওয়ামী ঘরানা ছাড়া দেশের সকল গণমাধ্যম এই কোটা সংস্কার আন্দোলনের খবর প্রচার করতে থাকে। অনলাইন অ্যাক্টিভিটিজ, সোশ্যাল মিডিয়া, ডিজিটাল মিডিয়া, নিউজ মিডিয়াসহ সকল ধরনের গণমাধ্যমে একযোগে কাজ করার ফলে আন্দোলনের প্রসার ঘটে। ফলে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলাসসহ শহর-নগর, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও আন্দোলন ক্রমে প্রসারিত হতে থাকে।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হতে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে পরে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিভিন্ন পেশাজীবী—সাংবাদিক, আইনজীবী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সুধী সমাজের প্রতিনিধিগণ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সাধারণ জনতা, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, অভিভাবক সকলের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দিন দিন আন্দোলনের নতুন গতিপথ ও সভা-সমাবেশ তৈরি করতে থাকে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী রাস্তায় বের হতে থাকে। মুসলিম-হিন্দু, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান—সকল ধর্মের মানুষের এই আন্দোলনে সম্পৃক্ততার ফলে এটি গণ-আন্দোলনে পরিণত হতে থাকে।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে টানা ৩৬ দিনের আন্দোলন শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জুলাই। শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সর্বশক্তি দিয়ে দমনের পথে হাঁটলে ১৫ জুলাই থেকে সহিংসতা আর ১৬ জুলাই থেকে প্রাণহানি শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে দমন-পীড়নের কারণে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকে। টানা ৩৬ দিনের এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

আমি কাজের প্রয়োজনে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় যাওয়া-আসা করতে গিয়ে মাঝে মাঝে এই আন্দোলনে যুক্ত হই, আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করি এবং মাঝে মাঝে ফেসবুক পোস্ট আপলোড করতে থাকি। আমি ছাত্র নই, তারপরেও তাদের দাবির সাথে একমত পোষণ করে ঢাকায় ও আমার নিজ এলাকার সাতকানিয়া কেরানীহাটে আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করতে থাকি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শুরুতে ছাত্রদের প্রধান দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতির সংস্কার। তবে ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ এবং নিপীড়নের কারণে এই আন্দোলন দ্রুত এক দফা দাবিতে রূপান্তরিত হয়। বিক্ষোভকারী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি এবং সরকারের অনুগত বাহিনী নির্বিচারে রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও তাজা গুলি ব্যবহার করে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদসহ শত শত নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সরাসরি বুকে ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী নারীরা যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন। এছাড়া সংখ্যালঘু ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে। আন্দোলন চলাকালে আটক বা তুলে নিয়ে গিয়ে বহু মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা এবং অনেককে গুম করা হয়।

এই চরম দমন-পীড়ন ও নিষ্ঠুরতা সাধারণ মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। ফলে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে জীবন বিসর্জন দেওয়ার ভয় জয় করে লাখ লাখ ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে, যা পরবর্তীতে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মাধ্যমে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটে এবং বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়; যা দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন ও বিতর্কিত আইনের ফলে খর্ব হওয়া নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সমাবেশের অধিকার পুনরুদ্ধার করে।

এখনও শহীদদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি এবং রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও ‘জুলাই সনদ’ কার্যকর করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো এখনও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, শহীদদের স্বীকৃতি এবং এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারের বিষয়টি বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত।

জুলাই ৪, ২০২৬