২১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনলাইন সংস্করণ

এ সম্পর্কিত আরও খবর

গ্রাম্য রাজনীতি বা ‘ভিলেজ পলিটিক্স’

লেখক: হুমায়ুন আহামেদ

চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবময় সাতকানিয়া উপজেলা। সাতকানিয়া তার সুদীর্ঘ ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এখানকার সামাজিক সম্প্রীতি চমৎকার, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পাশাপাশি মগ আদিবাসীদের বসবাসও রয়েছে।

২৮২.৪০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জনপদটি সমতল ভূমি, পাহাড় এবং সাঙ্গু ও ডলু নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। এর পূর্বে বান্দরবান জেলা, উত্তরে চন্দনাইশ, দক্ষিণে লোহাগাড়া এবং পশ্চিমে বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলা অবস্থিত। ১টি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সাতকানিয়া উপজেলার ১নং ইউনিয়ন চরতী ইউনিয়ন। বাঁশখালী ও আনোয়ারা এবং চন্দনাইশের কিছু অংশের বেষ্টনীতে ঘেরা সাঙ্গু নদীর প্রবাহে জেগে ওঠা এক বিশাল ইউনিয়ন চরতী। ২৩.৭১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ইউনিয়নে মোট ১০টি গ্রাম রয়েছে। দ্বীপ চরতী, মধ্যম চরতী, দক্ষিণ ব্রাহ্মণডেঙ্গা, উত্তর ব্রাহ্মণডেঙ্গা, উত্তর তুলাতুলী, দক্ষিণ কেশুয়া, দক্ষিণ তুলাতুলী, তালগাঁও, দুরদুরী এবং দক্ষিণ চরতী। আর ১নং চরতী ইউনিয়নের দক্ষিণ চরতী ৮ নং ওয়ার্ডেই আমার বাড়ি।

ছোটবেলার শৈশব কেটেছে সাঙ্গু নদীর বৈরী আবহাওয়া, শীতল মাটির স্পর্শ, নদীর উজান-ভাটার পানিতে শরীর ভিজিয়ে ঘরে ফেরা ও সন্ধ্যায় বড় গলায় বাংলা রিডিং পড়া ছিল আমার নিত্যদিনের কাজ। দক্ষিণ চরতী মজিদিয়া দাখিল মাদ্রাসায় পড়াকালীন শিক্ষানবিশকাল ২০০৪ সাল হতে ২০০৮ ইং—এই সময়টায় আমি যৌবনে পদার্পণ করেছি। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবতাম তখন অনায়াসে। কখনও শিক্ষানীতি, কখনও অর্থনীতি, রাজনীতি, স্বাস্থ্যনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, কখনও সমাজ, রাষ্ট্র, গ্রাম, শহর, দেশ, আবার কখনও পাহাড়, নদী, মরুভূমি, আকাশ, বাতাস, প্রেম, ভালোবাসা, সুন্দর মানুষ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে জানতে আগ্রহ ছিল প্রকট।

২০০৮ সালে পড়ালেখার উদ্দেশ্যে বান্দরবান শহরে চলে আসি এবং ১৩ সাল পর্যন্ত বান্দরবান শহরেই আমার বসবাস। দীর্ঘ পাঁচ বছর চরতী ইউনিয়নে আমার যোগাযোগ তেমন একটা ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখতাম মাঝে মাঝে। চরতী ইউনিয়নের রাজনীতি আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে; জন্মসূত্রে চরতী ইউনিয়ন আমার রাজনৈতিক এলাকা হওয়ায় এলাকার মানুষ নিয়ে কাজ করতে সব সময় চিন্তা করি। ২০১৯ সালে চরতী ইউনিয়ন ভোট অফিস এলাকায় আমি একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি এবং এলাকার মানুষের তাদের দুর্দশা ও প্রয়োজন খুব কাছ থেকে অনুভব করি। আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ছিলাম না, কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক ছিলাম, তাদের ভালো কাজ ও রাজনৈতিক ভালো চিন্তা-ভাবনার ওপর। আমি চরতী ইউনিয়নে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, স্বাস্থ্যনীতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এসকল বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে থাকি। আমার দেখা সেই কাল-২০১৬ হতে এই কাল-২০২৬ রাজনীতি, দীর্ঘ ১০ বছরের অবজারভেশন, চরতী ইউনিয়নের রাজনীতি ও তার প্রেক্ষাপট লিখতে চেষ্টা করলাম কেবল।

গ্রাম্য রাজনীতি বা ‘ভিলেজ পলিটিক্স’ হলো গ্রামীণ সমাজ ও স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামো নিয়ন্ত্রণের একটি প্রক্রিয়া। এটি প্রায়শই নীতি-আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তি স্বার্থ, গোষ্ঠীগত আধিপত্য এবং মাতবর বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হয়, যা গ্রামীণ সাধারণ মানুষকে স্বার্থান্বেষী মহলের হাতিয়ার করে তোলে। গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই বিভিন্ন গোষ্ঠীর (গোত্র বা বংশ) মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এর ফলে গ্রামের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ফাটল ধরে এবং অনেক সময় সাধারণ মানুষ মিথ্যা অভিযোগ বা হয়রানির শিকার হয়।

গ্রাম রাজনীতির মূল সফলতা নিহিত রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন বাস্তবায়ন, বিরোধ মীমাংসা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সরাসরি অংশগ্রহণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায়। ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার কাঠামোর মাধ্যমে এটি গ্রামীণ জনপদে সেবাপ্রাপ্তি সহজতর করে এবং জাতীয় রাজনীতির সাথে প্রান্তিক মানুষের মেলবন্ধন তৈরি করে। গ্রামীণ রাজনীতির ফলে রাস্তাঘাট, কালভার্ট এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার মতো মৌলিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সরাসরি বাস্তবায়িত হয়। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং ভিজিডি বা ভিজিএফের মতো সরকারি সহায়তা ও সামাজিক অনুদানগুলো সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে স্থানীয় গ্রাম রাজনীতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্থানীয় মুরব্বি ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত সালিশ ব্যবস্থা গ্রামীণ পর্যায়ের ছোটখাটো বিবাদ ও সামাজিক বিরোধ আদালতের বাইরে মীমাংসা করতে সাহায্য করে, যা গ্রামীণ শান্তি বজায় রাখে।

২০০৬ সালে ১নং চরতী ইউনিয়নের রাজনীতি মূলত জাতীয় রাজনীতি ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল। ওই সময়ে বাংলাদেশে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ মেয়াদকাল চলছিল এবং দেশব্যাপী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। ২০০৭ সালে চরতী ইউনিয়নসহ সমগ্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরিচালিত জরুরি অবস্থার আবহে। এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সকল প্রকার রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ ছিল। ১/১১-এর পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় চরতী ইউনিয়নের স্থানীয় পর্যায়ে কোনো দলীয় নির্বাচন, সভা বা প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন হয়নি।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন জামায়াতের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পুরো নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ দেখা যায়। ওই সময় সমগ্র সাতকানিয়া উপজেলাজুড়েই জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক ভিত্তি বেশ শক্তিশালী ছিল। এলাকার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মূলত জামায়াত এবং বিএনপির মতাদর্শের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। নব্বইয়ের দশক থেকে এই চরতী ইউনিয়ন নির্বাচনী এলাকায় একাধিকবার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন, ফলে ডা. রেজাউল করিম জামায়াতে ইসলামীর চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে বারবার জয়লাভ করেন। ১নং চরতী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. রেজাউল করিম এই চরতী ইউনিয়নের দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জনসেবা ও স্থানীয় রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সফলতা ও বিফলতা দুটিই পরিলক্ষিত হয়।

চরতী ইউনিয়নের রাজনীতিতে ২০১৮-২০২৪ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক সহিংসতার জেরে এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের হামলা-হয়রানি, চুরি-ডাকাতি, ভূমি দখল, মাদক বিক্রি, নিরীহ মানুষ হত্যা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমর্থকদের মারধর, মামলা বাণিজ্য, তাদের ঘর ভাঙা ও পোড়ানো, চাঁদাবাজি ইত্যাদি চরতী এলাকাটিকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে তৈরি করে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চরতী ইউনিয়নে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা গেছে। বিশেষ করে, স্থানীয় স্বার্থ ও বিভিন্ন প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে যেমন—বালু উত্তোলনের বিরোধ, মাটি কাটা, মাদক বিক্রয় সিন্ডিকেট প্রভাব বিস্তার, নদী দখল, মামলা-মোকদ্দমা ইত্যাদি।

(পরবর্তীতে বাকি লেখা ফেসবুকে আপলোড করা হবে।)

জুন ৩০, ২০২৬